পর্ব ৩
ভালোবাসার দিনগুলো কখন যে মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে ওঠে, তা কেউ বুঝতে পারে না। আর যখন সেই সুখের আকাশে প্রথম কালো মেঘ জমতে শুরু করে, তখনও মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না যে সামনে ঝড় অপেক্ষা করছে।
অর্ণব আর নীলার জীবনেও তেমনই একটি সময় এসেছিল।
কয়েক মাস আগেও যেখানে প্রতিটি সকাল শুরু হতো একে অপরের খোঁজখবর দিয়ে, এখন সেখানে অদ্ভুত এক দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করেছে।
প্রথমে বিষয়টা খুব ছোট মনে হয়েছিল।
নীলা আগের মতো ফোন করত না।
বার্তার উত্তর দিতে দেরি করত।
দেখা করার কথা বললে নানা অজুহাত দেখাত।
অর্ণব ভেবেছিল হয়তো পড়াশোনার চাপ বেড়েছে।
হয়তো পারিবারিক কোনো সমস্যা।
কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল, ততই সে বুঝতে পারল, বিষয়টা এতটা সহজ নয়।
একদিন বিকেলে অর্ণব ক্যাম্পাসের লেকের ধারে অপেক্ষা করছিল।
নীলা আসার কথা ছিল।
ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল।
দুই ঘণ্টা।
তবুও সে এল না।
অবশেষে ফোন করলে নীলা বলল,
—"আজ আসতে পারব না।"
—"কিন্তু তুমি তো কথা দিয়েছিলে।"
—"হঠাৎ কাজ পড়ে গেছে।"
—"একটা ফোন করে জানাতে পারতে।"
নীলার কণ্ঠে বিরক্তি ফুটে উঠল।
—"সবকিছুর জন্য কি জবাব দিতে হবে আমাকে?"
অর্ণব থমকে গেল।
এতদিনের পরিচয়ে এই প্রথম সে নীলার কণ্ঠে এমন কঠোরতা শুনল।
ফোন কেটে যাওয়ার পরও সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, কোথাও যেন কিছু বদলে যাচ্ছে।
কিন্তু কী?
সেই প্রশ্নের উত্তর তখনও তার জানা ছিল না।
কয়েকদিন পর ঘটনাটা ঘটল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ণব।
হঠাৎ সে দেখল, নীলা একজন ছেলের সঙ্গে কথা বলছে।
ছেলেটির নাম রায়হান।
তাদের বিভাগেরই ছাত্র।
মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী এবং সবার কাছে জনপ্রিয়।
অর্ণব বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিল।
কারণ বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কিন্তু ধীরে ধীরে সে লক্ষ্য করল, রায়হানের সঙ্গে নীলার যোগাযোগ বাড়ছে।
প্রায়ই তাদের একসঙ্গে দেখা যায়।
কখনও লাইব্রেরিতে, কখনও ক্যান্টিনে।
প্রথমে অর্ণব নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল।
ভালোবাসার মধ্যে বিশ্বাস থাকতে হয়।
সন্দেহ দিয়ে কোনো সম্পর্ক টিকে না।
তবুও তার মনের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি জন্ম নিতে শুরু করল।
অন্যদিকে, ঠিক সেই সময় থেকেই নীলার আচরণও বদলে যেতে লাগল।
সে যেন ইচ্ছে করেই অর্ণবকে এড়িয়ে চলছিল।
একদিন অর্ণব সাহস করে জিজ্ঞেস করল,
—"নীলা, তোমার কি কিছু হয়েছে?"
—"না।"
—"তাহলে তুমি এত দূরে দূরে থাকছ কেন?"
—"আমি কি দূরে সরে গেছি?"
—"তুমি নিজেই জানো উত্তরটা।"
নীলা কিছুক্ষণ নীরব রইল।
তারপর বলল,
—"সবকিছু আগের মতো থাকে না, অর্ণব।"
কথাটা শুনে অর্ণবের বুকটা কেঁপে উঠল।
কারণ সে বুঝতে পারছিল, এই কথার ভেতরে এমন কিছু আছে যা নীলা বলতে চাইছে না।
এর কয়েকদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ল।
কেউ একজন নীলাকে বলেছে, অর্ণব নাকি অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশছে।
শুধু তাই নয়, সে নাকি বন্ধুদের কাছে বলেছে, নীলার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে সে নিশ্চিত নয়।
গুজবটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল।
কিন্তু মিথ্যা কথা অনেক সময় সত্যের চেয়েও দ্রুত মানুষের মনে জায়গা করে নেয়।
বিশেষ করে যখন সেই মিথ্যা বিশ্বাস করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
নীলার মনেও সন্দেহের বীজ রোপিত হলো।
সে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করল না।
বরং নিজের ভেতরেই উত্তর খুঁজতে শুরু করল।
আর সেই নীরবতাই ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ককে বিষিয়ে তুলতে লাগল।
এক সন্ধ্যায় অর্ণব তাকে দেখা করতে বলল।
অনেক অনুরোধের পর নীলা রাজি হলো।
তারা সেই পুরোনো লেকের ধারে বসেছিল, যেখানে একদিন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল।
কিন্তু আজকের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দুজনের মাঝখানে যেন অদৃশ্য একটি দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে।
অর্ণব ধীরে বলল,
—"তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?"
নীলা চোখ নামিয়ে বলল,
—"তুমি কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো?"
প্রশ্নটা শুনে অর্ণব অবাক হয়ে গেল।
—"এই প্রশ্ন কেন?"
—"উত্তর দাও।"
—"অবশ্যই ভালোবাসি।"
—"তাহলে অন্যদের কাছে কেন বলেছ, আমাদের সম্পর্ক নিয়ে তুমি নিশ্চিত নও?"
অর্ণব যেন আকাশ থেকে পড়ল।
—"কি বলছ তুমি?"
—"সবাই মিথ্যা বলছে, শুধু তুমি সত্যি?"
—"কারা এসব বলেছে?"
—"সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।"
—"খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমি এমন কিছু কখনও বলিনি।"
নীলা তিক্ত হেসে বলল,
—"তুমি হয়তো ভাবছ আমি কিছুই বুঝি না।"
—"নীলা, তুমি আমাকে চেনো। আমি কি এমন মানুষ?"
—"আমি জানি না।"
এই তিনটি শব্দ যেন অর্ণবের হৃদয়ে ছুরি হয়ে বিঁধল।
"আমি জানি না।"
যে মানুষ একদিন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, "আমি তোমার ওপর বিশ্বাস করি", আজ সেই মানুষই বলছে, "আমি জানি না।"
অর্ণব মরিয়া হয়ে বোঝানোর চেষ্টা করল।
সে বলল,
—"আমাকে একবার বিশ্বাস করো। আমি কখনও তোমাকে ঠকাইনি।"
কিন্তু নীলা যেন শুনতেই চাইছিল না।
তার মনে ইতিমধ্যে সন্দেহ জায়গা করে নিয়েছে।
আর সন্দেহ একবার হৃদয়ে ঢুকে গেলে ভালোবাসার ভাষা শুনতে পায় না।
দিনগুলো আরও কঠিন হয়ে উঠল।
নীলা ধীরে ধীরে অর্ণবের জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে শুরু করল।
ফোন বন্ধ।
বার্তার উত্তর নেই।
দেখা করার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান।
অর্ণব প্রতিদিন চেষ্টা করত।
প্রতিদিন বোঝাতে চাইত।
কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হতো।
রাতের পর রাত সে জেগে থাকত।
ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকত।
হয়তো নীলা একটি বার্তা পাঠাবে।
হয়তো বলবে, "আমি ভুল করেছি।"
কিন্তু কিছুই ঘটত না।
এক রাতে অর্ণব নীলাকে একটি দীর্ঘ বার্তা লিখল।
"আমি জানি না কে তোমার মনে সন্দেহ ঢুকিয়েছে। কিন্তু আমি জানি, আমি তোমাকে কখনও মিথ্যা বলিনি। যদি আমার কোনো ভুল থাকে, আমাকে শাস্তি দাও। কিন্তু অন্তত আমার কথা একবার শোনো।"
বার্তাটি পাঠানোর পর সে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল।
এক ঘণ্টা।
দুই ঘণ্টা।
পুরো রাত।
কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
সেই নীরবতা ছিল শব্দের চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক।
সেই প্রথমবার অর্ণব অনুভব করল, হয়তো তাদের সম্পর্ক সত্যিই ভেঙে যেতে পারে।
যে মানুষটিকে ছাড়া সে ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারত না, সেই মানুষটি আজ তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
আর সে কিছুই করতে পারছে না।
পরদিন সকালে ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে অর্ণব দূর থেকে নীলাকে দেখল।
একসময় যে মেয়েটি তাকে দেখলেই হাসত, আজ সে চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
অর্ণবের বুকের ভেতর হাহাকার করে উঠল।
কারণ সে বুঝতে পারল—
এটা শুধু সাময়িক অভিমান নয়।
এটা এমন এক দূরত্ব, যার শেষ কোথায়, সে জানে না।
আর সেই মুহূর্তে প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
হয়তো ভালোবাসা সব সময় সব বাধা জয় করতে পারে না।
কখনও কখনও একটি ভুল বোঝাবুঝি, একটি মিথ্যা কথা, একটি সন্দেহই যথেষ্ট হয় দুটো হৃদয়ের মাঝখানে অন্ধকার নামিয়ে আনতে।
আর সেই অন্ধকারের শুরু হয়ে গেছে।
চলবে...........