ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:১০:৪০ AM

উপন্যাস: তোমার মুখ”

মান্নান মারুফ
01-06-2026 08:17:13 PM
উপন্যাস: তোমার মুখ”

পর্ব ২

প্রথম দেখা থেকে শুরু হওয়া গল্পটা ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে অর্ণব আর নীলা কেউই একে অপরকে ছাড়া নিজেদের কল্পনা করতে পারত না।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পর্কের গভীরতা বেড়েছিল। বন্ধুত্বের সেই সহজ-সরল পথ পেরিয়ে তারা প্রবেশ করেছিল এক অনুচ্চারিত ভালোবাসার জগতে।

যদিও মুখে কেউ কখনও স্পষ্ট করে কিছু বলেনি, তবুও দুজনেই বুঝত—তাদের হৃদয়ের ভাষা একই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো যেন নতুন রঙে রাঙিয়ে উঠেছিল।

সকালের প্রথম ক্লাস থেকে বিকেলের শেষ আড্ডা পর্যন্ত, প্রতিটি মুহূর্তে তারা একে অপরের উপস্থিতি খুঁজে নিত।

অর্ণবের দিন শুরু হতো নীলার একটি ছোট্ট বার্তা দিয়ে—

"ঘুম থেকে উঠেছ?"

আর রাত শেষ হতো—

"ভালো থেকো, স্বপ্নে দেখা হবে।"

সাধারণ এই কথাগুলোও অর্ণবের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান শব্দ মনে হতো।

একদিন ক্লাস শেষে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের পুরোনো লেকের ধারে বসেছিল।

বিকেলের মৃদু বাতাস পানির ওপর ঢেউ তুলছিল।

নীলা হঠাৎ বলল,

—"জানো, কখনও কখনও আমার খুব ভয় হয়।"

—"কিসের ভয়?"

—"যদি কোনোদিন তোমাকে হারিয়ে ফেলি?"

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—"যে মানুষ সত্যি ভালোবাসে, তাকে এত সহজে হারানো যায় না।"

নীলা চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

সেই দৃষ্টির মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত নির্ভরতা।

যেন সে বিশ্বাস করতে চাইছিল, অর্ণব সত্যিই তার জীবনে চিরকাল থাকবে।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে প্রথমবার নীলা নিজের ইচ্ছায় অর্ণবের হাত ধরেছিল।

মুহূর্তটা খুব সাধারণ ছিল।

কিন্তু অর্ণবের কাছে মনে হয়েছিল পুরো পৃথিবী যেন থেমে গেছে।

তার হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠেছিল।

নীলা মৃদু হেসে বলেছিল,

—"এত নার্ভাস হচ্ছো কেন?"

—"কারণ কিছু কিছু সুখ হঠাৎ করে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না।"

নীলা উত্তর দেয়নি।

শুধু হাতটা আরও শক্ত করে ধরেছিল।

সেদিনের সেই স্পর্শ বহুদিন অর্ণবের হৃদয়ে রয়ে গিয়েছিল।

এরপর থেকে তাদের সম্পর্ক আর আগের মতো ছিল না।

তারা দুজনেই জানত, এই অনুভূতির নাম ভালোবাসা।

কিন্তু কেউই তাড়াহুড়ো করে তা উচ্চারণ করতে চাইছিল না।

কারণ কখনও কখনও কিছু অনুভূতি শব্দের চেয়েও বেশি সুন্দর হয়।

দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল।

একসঙ্গে লাইব্রেরিতে পড়া, ক্যান্টিনে চা খাওয়া, বৃষ্টিতে ভেজা, ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ঝগড়া, আবার কিছুক্ষণ পর মিল হয়ে যাওয়া—সবকিছু মিলিয়ে তাদের জীবন যেন এক মায়াময় ছন্দে বাঁধা পড়েছিল।

একদিন বিকেলে প্রবল বৃষ্টি নামল।

ক্যাম্পাসের সবাই ছুটে আশ্রয় খুঁজছে।

অর্ণব আর নীলা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে।

চারপাশে বৃষ্টির শব্দ।

নীলা হেসে বলল,

—"চলো ভিজি।"

—"পাগল নাকি?"

—"হ্যাঁ, একটু।"

কথা শেষ করেই সে বৃষ্টির মধ্যে দৌড় দিল।

অর্ণবও তার পিছু নিল।

সেদিন তারা শিশুর মতো ভিজেছিল।

হাসতে হাসতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল।

সেই মুহূর্তে পৃথিবীতে যেন আর কোনো দুঃখ ছিল না।

শুধু ছিল দুটো মানুষের নির্মল সুখ।

কিন্তু সুখের দিনগুলোর মাঝেও বাস্তবতা ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছিল।

প্রথম আভাসটা এসেছিল নীলার পরিবার থেকে।

নীলার বাবা ছিলেন কঠোর স্বভাবের মানুষ।

মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল।

তিনি চাইতেন নীলা পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হোক, তারপর পরিবারের পছন্দের কাউকে বিয়ে করুক।

ভালোবাসা কিংবা সম্পর্কের বিষয়গুলো তিনি খুব একটা ভালো চোখে দেখতেন না।

একদিন নীলা খুব মন খারাপ করে অর্ণবকে বলল,

—"বাবা যদি আমাদের ব্যাপারটা জানতে পারেন, খুব রাগ করবেন।"

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—"আমরা তো কোনো ভুল করছি না।"

—"জানি। কিন্তু সবাই কি সেটা বুঝবে?"

অর্ণব উত্তর খুঁজে পেল না।

কারণ বাস্তবতা অনেক সময় সত্যের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এরপর থেকে নীলার মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে লাগল।

যদিও সে অর্ণবকে আগের মতোই ভালোবাসত, তবুও ভবিষ্যতের চিন্তা তাকে কষ্ট দিতে শুরু করেছিল।

এক সন্ধ্যায় তারা নদীর ধারে বসেছিল।

আকাশে লালচে সূর্যাস্ত।

চারপাশে নীরবতা।

নীলা হঠাৎ বলল,

—"যদি আমাদের পথ আলাদা হয়ে যায়?"

অর্ণব এবার একটু বিরক্ত হলো।

—"তুমি বারবার এসব কথা বলো কেন?"

—"কারণ আমি ভয় পাই।"

—"আমি পাই না।"

—"কেন?"

অর্ণব দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

—"কারণ আমি বিশ্বাস করি, ভালোবাসা হার মানে না।"

নীলার চোখ ভিজে উঠল।

সে আস্তে করে বলল,

—"তুমি এত বিশ্বাস কোথায় পাও?"

অর্ণব মৃদু হেসে উত্তর দিল,

—"তোমার চোখ থেকে।"

নীলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

সেই মুহূর্তে অর্ণব তার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলল,

—"শোনো, জীবন সহজ হবে না। বাধা আসবে। মানুষ কথা বলবে। হয়তো আমাদের অনেক কিছু সহ্য করতে হবে। কিন্তু আমি কখনও তোমার হাত ছাড়ব না।"

নীলা কাঁপা কণ্ঠে বলল,

—"প্রতিশ্রুতি?"

—"প্রতিশ্রুতি।"

সেদিন দুজনেই বিশ্বাস করেছিল, তাদের ভালোবাসা সবকিছুকে জয় করবে।

তারা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল একটি ভবিষ্যতের।

একটি ছোট্ট বাড়ি।

একটি বারান্দা।

সন্ধ্যায় দুজনে বসে চা খাওয়া।

বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করা।

ছোট ছোট সুখের মুহূর্তে ভরা একটি জীবন।

অর্ণব মনে মনে সেই জীবনকে নিজের বাস্তবতা হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেছিল।

সে বিশ্বাস করত, পৃথিবীতে যত বাধাই আসুক, নীলা তার পাশেই থাকবে।

অন্যদিকে নীলাও সেই স্বপ্নগুলো ভালোবাসত।

কিন্তু তার হৃদয়ের গভীরে কোথাও একটা অজানা আশঙ্কা লুকিয়ে ছিল।

যেন সে অনুভব করছিল, সামনে কোনো ঝড় অপেক্ষা করছে।

তবুও সে সেই ভয়কে পাত্তা দিতে চাইত না।

কারণ ভালোবাসা মানুষকে আশাবাদী করে তোলে।

যে ভবিষ্যৎকে ছুঁতে পারে না, সেই ভবিষ্যৎকেও নিজের বলে বিশ্বাস করতে শেখায়।

সেদিন রাতেও নীলা অর্ণবকে একটি বার্তা পাঠিয়েছিল—

"যদি কোনোদিন আমি খুব দূরে চলে যাই, তবুও আমাকে ভুলে যেও না।"

অর্ণব উত্তর দিয়েছিল—

"তুমি আমার জীবনের অংশ নও, তুমি আমার জীবন। মানুষ নিজের জীবনকে ভুলে যেতে পারে না।"

বার্তাটি পড়ে নীলা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।

তার চোখ ভিজে উঠেছিল।

কারণ সে জানত না, ভবিষ্যৎ তাদের জন্য কী লিখে রেখেছে।

জানত না, আজ যে ভালোবাসা তাদের এত সুখ দিচ্ছে, একদিন সেই ভালোবাসাই তাদের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠবে।

কিন্তু সেই রাত পর্যন্ত তারা শুধু স্বপ্ন দেখেছিল।

ভালোবাসার স্বপ্ন।

একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন।

আর সেই স্বপ্নের আলোয় তাদের পৃথিবী তখনও উজ্জ্বল ছিল।

অর্ণব তখনও জানত না—

একদিন এই সুখের স্মৃতিগুলোই তার ভাঙা হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর ক্ষত হয়ে থাকবে। চলবে......