ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:০৯:৪৩ AM

উপন্যাস:তোমার মুখ”

মান্নান মারুফ
01-06-2026 08:13:52 PM
উপন্যাস:তোমার মুখ”

পর্ব ১

বিকেলের শেষ আলো তখন ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোর ভিড়ে। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সোনালি রঙ যেন দিনের শেষ হাসিটুকু বিলিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীকে। এমনই এক বিকেলে প্রথম দেখা হয়েছিল অর্ণব আর নীলার।

অর্ণব তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। শান্ত স্বভাবের, স্বপ্নবিলাসী এক তরুণ। বই পড়তে ভালোবাসত, একা একা আকাশ দেখতে ভালোবাসত, আর ভালোবাসত নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে। তার জীবনে তখনও বিশেষ কোনো মানুষ আসেনি, যার জন্য হৃদয়ের ভেতর আলাদা কোনো জায়গা তৈরি হবে।

সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুর পারে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ণব। হাতে কয়েকটি বই, চোখে হালকা ক্লান্তি। হঠাৎ পাশ থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল—

—"এক্সকিউজ মি, এই বইটা কি আপনার?"

অর্ণব ঘুরে তাকাল।

প্রথম দেখাতেই যেন সময় থমকে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির চোখদুটো ছিল অদ্ভুত সুন্দর। গভীর, শান্ত, আর মায়াভরা। হাতে একটি বই, মুখে মিষ্টি হাসি।

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল।

মেয়েটি আবার বলল—

—"শুনছেন? বইটা কি আপনার?"

অর্ণব হকচকিয়ে উঠে বলল,

—"জি... হ্যাঁ, আমারই।"

মেয়েটি বইটা বাড়িয়ে দিয়ে হাসল।

—"মাটিতে পড়ে গিয়েছিল।"

—"ধন্যবাদ।"

—"ওয়েলকাম।"

এতটুকুই ছিল তাদের প্রথম কথা।

কিন্তু কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পগুলো শুরু হয় খুব ছোট্ট একটি মুহূর্ত থেকে।

পরের কয়েকদিন অর্ণব বারবার সেই মেয়েটিকে দেখতে পেল। কখনও লাইব্রেরিতে, কখনও ক্যাম্পাসের পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে, কখনও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে।

একদিন সাহস করে সে জানতে পারল মেয়েটির নাম—নীলা।

নামটা শুনেই অর্ণবের মনে হয়েছিল, এই নামের মধ্যেও যেন একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে।

ধীরে ধীরে তাদের কথা বাড়তে লাগল।

প্রথমে পড়াশোনা নিয়ে, তারপর বই নিয়ে, গান নিয়ে, সিনেমা নিয়ে, আর একসময় জীবনের গল্প নিয়েও।

নীলা ছিল প্রাণবন্ত।

সে হাসতে ভালোবাসত।

অর্ণবের বিষণ্ণ মনেও সে হাসি এনে দিতে পারত।

একদিন বৃষ্টিভেজা বিকেলে ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে বসে দুজন চা খাচ্ছিল।

বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি।

নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল—

—"জানো, আমার না বৃষ্টি খুব ভালো লাগে।"

—"কেন?"

—"মনে হয় বৃষ্টি সব দুঃখ ধুয়ে নিয়ে যায়।"

অর্ণব মৃদু হেসে বলল—

—"সব দুঃখ কি সত্যিই ধুয়ে যায়?"

নীলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—

—"হয়তো না। কিন্তু মানুষ অন্তত কিছুক্ষণ ভুলে থাকতে পারে।"

সেদিন প্রথমবার অর্ণব অনুভব করল, নীলা শুধু সুন্দর নয়; তার ভেতরেও গভীর এক পৃথিবী আছে।

সেই পৃথিবীর প্রতি অদ্ভুত এক টান জন্ম নিতে লাগল তার।

দিনগুলো দ্রুত এগোতে লাগল।

ক্লাস শেষে একসঙ্গে হাঁটা, লাইব্রেরিতে বসে পড়া, বিকেলের চা, মাঝরাতে মেসেজে গল্প—সবকিছু যেন তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এল।

একদিন নীলা হঠাৎ বলল—

—"অর্ণব, তুমি কি কখনও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবো?"

—"অনেক ভাবি।"

—"কী ভাবো?"

অর্ণব আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—

—"একটা ছোট্ট বাড়ি হবে। অনেক বই থাকবে। জানালার পাশে একটা দোলনা চেয়ার থাকবে। আর সন্ধ্যায় বসে গল্প করব।"

নীলা হেসে ফেলল।

—"তোমার স্বপ্নগুলোও তোমার মতো শান্ত।"

—"আর তোমার?"

নীলা কিছুক্ষণ ভেবে বলল—

—"আমি এমন একটা জীবন চাই, যেখানে কেউ আমাকে বুঝবে। কোনো অভিনয় থাকবে না, কোনো মিথ্যে থাকবে না।"

অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে রইল।

কেন জানি মনে হলো, সে হয়তো সেই মানুষ হতে চায়।

সেই দিন থেকেই অর্ণবের হৃদয়ে ভালোবাসার বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করল।

তবে সে কিছু বলেনি।

কারণ সে ভয় পেত।

ভয় পেত যদি এই সুন্দর বন্ধুত্ব হারিয়ে যায়।

কিন্তু হৃদয় কি কখনও নিয়ম মানে?

যত দিন যেতে লাগল, ততই নীলাকে ছাড়া সবকিছু অসম্পূর্ণ মনে হতে লাগল তার।

একদিন নীলা অসুস্থ হয়ে ক্লাসে আসেনি।

সারাদিন অর্ণবের মন খারাপ হয়ে ছিল।

সেদিনই সে বুঝতে পারল, নীলা শুধু একজন বন্ধু নয়।

তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু।

সন্ধ্যায় ফোন করে সে জিজ্ঞেস করল—

—"এখন কেমন আছো?"

নীলা অবাক হয়ে বলল—

—"তুমি এত চিন্তা করছো কেন?"

অর্ণব একটু থেমে বলল—

—"কারণ... তুমি গুরুত্বপূর্ণ।"

ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর নীলা আস্তে করে বলল—

—"তুমিও।"

সেই একটি শব্দ অর্ণবের হৃদয়ে অদ্ভুত আলো জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

এরপর থেকে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে উঠল।

তারা একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে শুরু করল।

কোনো আনন্দের খবর হলে প্রথম জানাত একে অপরকে।

কোনো কষ্ট এলে সবার আগে খুঁজত একে অপরকে।

অর্ণব বুঝতে পারছিল, সে ধীরে ধীরে নীলার প্রেমে পড়ছে।

আর সেই প্রেম ছিল নিঃশব্দ, গভীর এবং সত্য।

একদিন সূর্যাস্তের সময় দুজন ক্যাম্পাসের লেকের ধারে বসেছিল।

আকাশজুড়ে লাল আভা।

পানিতে সূর্যের শেষ আলো ঝিকমিক করছে।

নীলা হঠাৎ বলল—

—"যদি একদিন আমরা হারিয়ে যাই?"

অর্ণব অবাক হয়ে তাকাল।

—"কেন হারাব?"

—"জীবনে তো অনেক কিছু বদলে যায়।"

অর্ণব দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

—"সবকিছু বদলালেও কিছু মানুষ বদলায় না।"

নীলা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

সেই হাসির মধ্যে যেন অদ্ভুত এক বিশ্বাস ছিল।

সেদিন বাড়ি ফিরে অর্ণব অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

রাতের আকাশে একফালি চাঁদ উঠেছিল।

সে মনে মনে ভাবল—

"এই মেয়েটাকেই আমি সারাজীবন পাশে চাই।"

প্রথমবারের মতো সে ভবিষ্যতের প্রতিটি স্বপ্নে নীলাকে দেখতে শুরু করল।

তার মনে হতে লাগল, জীবনের অসম্পূর্ণ গল্পগুলো নীলাকে ছাড়া কখনও পূর্ণ হবে না।

সে বিশ্বাস করতে শুরু করল, পৃথিবীতে যদি কোনো মানুষ তার জন্য তৈরি হয়ে থাকে, তবে সে মানুষটি নীলা।

অর্ণব জানত না ভবিষ্যৎ কী লিখে রেখেছে তাদের জন্য।

জানত না সুখের আকাশে একদিন বিচ্ছেদের কালো মেঘ জমবে।

জানত না এই হাসিমাখা দিনগুলোর স্মৃতিই একদিন তার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হয়ে উঠবে।

কিন্তু সেই মুহূর্তে সে শুধু একটি বিষয় জানত—

নীলার চোখের দিকে তাকালে তার পৃথিবীটা সুন্দর লাগে।

আর সেই সৌন্দর্যের ভেতর দাঁড়িয়ে সে প্রথমবারের মতো স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল একটি দীর্ঘ জীবনের।

যে জীবনের প্রতিটি সকাল শুরু হবে নীলার হাসিতে, আর প্রতিটি রাত শেষ হবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে।

সেই স্বপ্নের নাম ছিল—ভালোবাসা।

আর সেই ভালোবাসার শুরু হয়েছিল এক বিকেলে, একটি পড়ে যাওয়া বই আর একটি মায়াভরা হাসি থেকে। চলবে............