পর্ব ৬
“ভালোবাসা হচ্ছে সবসময় অন্তরে থাকা যে নাম বা মানুষটি...”
সময় মানুষকে অনেক দূরে নিয়ে যায়, কিন্তু কিছু অনুভূতিকে কখনো পুরোনো করতে পারে না।
বছরের পর বছর কেটে গেছে।
কুদ্দুস এখন শহরের পরিচিত একজন শিক্ষক। চুলের পাশে অল্প পাক ধরেছে। তার ভেতরের নীরবতাও যেন আরও গভীর হয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময় ছাত্রদের নিয়ে কাটে, আর রাতগুলো পুরোনো বই, বৃষ্টি আর কিছু না-বলা স্মৃতির সঙ্গে।
নিহারিকাও বদলেছে।
ঢাকার ব্যস্ত জীবনে সে এখন পরিচিত একটি প্রকাশনীর সম্পাদক। বইয়ের ভেতর দিয়েই তার দিন কাটে। লেখকদের ভিড়, সাহিত্য আলোচনা, নতুন বইয়ের গন্ধ—সবকিছুর মাঝেও কোথাও যেন এক শূন্যতা রয়ে গেছে।
কিছু শূন্যতা মানুষ ইচ্ছে করলেও পূরণ করতে পারে না।
সেদিন ছিল শীতের শেষ বিকেল।
রাজশাহীতে একটি সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে লেখক, কবি, শিক্ষক, পাঠক—অনেকেই এসেছিল সেখানে।
কুদ্দুসও কলেজের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছিল।
মাঠজুড়ে ছোট ছোট বইয়ের স্টল, বাতাসে কাগজের গন্ধ, দূরে মঞ্চে কবিতা আবৃত্তির মৃদু শব্দ—সব মিলিয়ে জায়গাটার ভেতরে অদ্ভুত এক মায়া ছিল।
সূর্য তখন ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছিল।
কুদ্দুস বইয়ের স্টল ঘুরছিল নির্লিপ্তভাবে। হাতে একটি কবিতার বই। ঠিক তখনই পাশের স্টলে দাঁড়ানো একজন মেয়ের দিকে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল।
নীল শাড়ি।
খোলা চুল।
চোখের ভেতরে সেই একই গভীর শান্তি।
কুদ্দুসের বুকের ভেতরটা আচমকা থেমে গেল যেন।
নিহারিকা।
অনেক বছর পরও মানুষ কিছু মুখ ভুলতে পারে না।
তারা দু’জনই কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে এত মানুষ, এত শব্দ—তবুও সেই মুহূর্তে পৃথিবীটা কেমন নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল।
নিহারিকা ধীরে মুখ তুলল।
চোখে বিস্ময় ছিল না। বরং ছিল এক দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্ত কোমলতা।
মনে হচ্ছিল, সে যেন জানত—একদিন না একদিন এমন দেখা হবেই।
কুদ্দুসের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল কিছু বলতে।
“কেমন আছো?”
অথবা—
“এতদিন পর?”
কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।
কারণ কিছু অনুভূতির সামনে ভাষা খুব ছোট হয়ে যায়।
বিকেলের আলো তখন আরও নরম হয়ে এসেছে।
দূরে কেউ জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তি করছিল—
“আবার আসিব ফিরে...”
নিহারিকা ধীরে বইটি বন্ধ করল। তার আঙুলের ভাঁজে সময়ের ক্লান্তি জমে ছিল, কিন্তু চোখ দুটো এখনও আগের মতোই গভীর।
কুদ্দুস বুঝতে পারছিল, এই কয়েক বছরে অনেক কিছু বদলেছে।
তবুও কিছু জিনিস একদম বদলায়নি।
যেমন—নিহারিকাকে দেখলে এখনও তার বুকের ভেতর অকারণে কেঁপে ওঠে।
তারা পাশাপাশি হাঁটছিল বইমেলার ভিড়ের মধ্যে।
কেউ খুব বেশি কথা বলছিল না।
শুধু মাঝেমধ্যে চোখাচোখি হচ্ছিল।
আর সেই চোখের ভেতর দিয়ে পুরোনো দিনের অসংখ্য স্মৃতি নিঃশব্দে ফিরে আসছিল।
লাইব্রেরির সেই প্রথম বিকেল।
কদম ফুল।
চিঠির অপেক্ষা।
বৃষ্টির রাত।
মিসড কল।
সবকিছু যেন আবার ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল।
একসময় নিহারিকা খুব আস্তে বলল,
— “তুমি বদলাওনি।”
কুদ্দুস মৃদু হেসে বলল,
— “সময় শুধু চেহারা বদলায়।”
তারপর আবার নীরবতা।
তবুও সেই নীরবতায় অস্বস্তি ছিল না।
বরং ছিল বহুদিনের চেনা আশ্রয়।
সন্ধ্যা নামার পর অনুষ্ঠানস্থলের আলো জ্বলে উঠল।
শীতের হালকা বাতাসে চারপাশ কেমন বিষণ্ন সুন্দর হয়ে উঠেছিল।
দূরে চায়ের দোকানে পুরোনো গান বাজছিল।
“এই পথ যদি না শেষ হয়...”
নিহারিকা কিছুক্ষণ গানটা শুনল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
— “জানো, কিছু গান এখনও তোমার কথা মনে করিয়ে দেয়।”
কুদ্দুস চোখ নামিয়ে নিল।
তার ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘ বছরের নীরবতা যেন একটু নড়ে উঠল।
সে বুঝতে পারছিল, এতদিন পরও তাদের মাঝের অনুভূতিটা কোথাও হারিয়ে যায়নি।
শুধু সময়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল।
কেউ কাউকে কোনো অভিযোগ করেনি।
কেউ বলেনি—
“তুমি কেন চলে গেলে?”
অথবা—
“তুমি কেন থামাওনি?”
কারণ তারা দু’জনেই জানত, জীবন কখনো কখনো মানুষকে এমন সব দূরত্বের সামনে দাঁড় করায়, যেখানে ভালোবাসা থাকলেও একসঙ্গে থাকা সম্ভব হয় না।
তবুও অনুভূতি মরে না।
সেটা মানুষের ভেতরে থেকে যায়।
নিহারিকা একসময় আকাশের দিকে তাকাল।
শীতের স্বচ্ছ আকাশে ছোট্ট একফালি চাঁদ উঠেছে।
তার মনে হলো, এই মানুষটার সঙ্গে তার সম্পর্কটা ঠিক আকাশের মতো।
দূরে থেকেও সবসময় মাথার ওপর থাকে।
অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে।
মানুষজন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিল।
স্টলের আলো নিভতে শুরু করেছে।
কুদ্দুস আর নিহারিকা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল, অথচ দু’জনের মাঝখানে জমে ছিল বহু বছরের না-বলা কথা।
নিহারিকার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল বলতে—
“আমি তোমাকে কোনোদিন ভুলিনি।”
কিন্তু সে বলেনি।
কুদ্দুসেরও ইচ্ছে হচ্ছিল বলতে—
“তুমি এখনও আমার ভেতরে আছো।”
সেও বলেনি।
কিছু ভালোবাসা উচ্চারণ না করলেও পূর্ণ থাকে।
বিদায়ের আগে নিহারিকা শুধু একবার তাকিয়েছিল কুদ্দুসের দিকে।
সেই দৃষ্টিতে ক্লান্তি ছিল, মায়া ছিল, আর ছিল এক গভীর নিশ্চয়তা—
কিছু মানুষ কখনো জীবনের বাইরে চলে যায় না।
তারা নীরবে থেকে যায় অন্তরের খুব গভীরে।
কুদ্দুসও তাকিয়ে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, বহুদিন পর হারিয়ে যাওয়া কোনো ঋতু আবার ফিরে এসেছে।
হয়তো ক্ষণিকের জন্য।
তবুও ফিরে এসেছে।
দূরে তখন রাতের ট্রেনের শব্দ ভেসে আসছিল।
আর সেই শব্দের ভেতর দু’জন মানুষ নিঃশব্দে অনুভব করছিল—
সময় তাদের আলাদা করেছে ঠিকই, কিন্তু মুছে দিতে পারেনি।
চলবেৃৃ......