পর্ব ৫
“ঠিক তেমনিই নিহারিকার মনেও কুদ্দুসের কথা অন্তরে থাকতো...”
মানুষের জীবনে কিছু সিদ্ধান্ত আসে, যেগুলো নেওয়ার সময় বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে; তবুও সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কারণ কিছু ভালোবাসা আছে, যেগুলোর সঙ্গে আপস করা যায় না।
নিহারিকা শেষ পর্যন্ত বিয়েটা ভেঙে দিয়েছিল।
ঘরের ভেতর তখন অশান্তি। আত্মীয়স্বজনের চোখে বিস্ময়, মায়ের চোখে কষ্ট, বাবার কণ্ঠে রাগ ।
— “একটা মেয়ের এত জেদ ভালো না,” বাবা কঠিন গলায় বলেছিলেন।
নিহারিকা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। সে কাউকে বোঝাতে পারেনি কেন তার ভেতরটা শূন্য লাগে। কেন সমস্ত আয়োজনের মাঝেও সে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না।
কারণ কিছু অনুভূতির ব্যাখ্যা ভাষায় দেওয়া যায় না।
সেদিন রাতে মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন,
— “কাউকে কি ভালোবাসিস?”
নিহারিকা উত্তর দেয়নি।
শুধু জানালার বাইরে তাকিয়েছিল। ঢাকার আকাশে তখন মেঘ জমছিল।
তার মনে হচ্ছিল, দূরের কোনো ছোট শহরে হয়তো এই মুহূর্তে কুদ্দুসও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
অন্যদিকে কুদ্দুসও কালীগঞ্জ ছেড়ে চলে যাচ্ছিল।
জেলার এক কলেজে শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছে সে। শহরটা অনেক দূরে। ট্রেনে যেতে হয় প্রায় সাত ঘণ্টা।
কালীগঞ্জ স্টেশনে সেদিন আকাশ ভারী ছিল। প্ল্যাটফর্মে বৃষ্টির পানি জমে ছিল ছোট ছোট আয়নার মতো।
কুদ্দুস হাতে ছোট্ট একটি ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পাশে ছিল কয়েকটি বই আর পুরোনো টিনের বাক্সটি—যার ভেতরে এখনও যতœ করে রাখা আছে নিহারিকার সব চিঠি।
ট্রেন আসার আগে হঠাৎ তার মনে হলো, এই শহরে সে আসলে কী ফেলে যাচ্ছে?
কিছু রাস্তা, কিছু বিকেল, আর একটি নাম।
যে নাম বহুদিন ধরে তার অন্তরের ভেতর নীরবে বাস করছে।
ট্রেনের হুইসেল বাজতেই বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল।
বৃষ্টিভেজা জানালার পাশে বসে কুদ্দুস শেষবারের মতো কালীগঞ্জ স্টেশনের দিকে তাকাল।
মনে হলো, অপেক্ষারও বুঝি একটা শহর থাকে।
যেখানে মানুষ চলে যায়, কিন্তু অনুভূতিগুলো থেকে যায়।
নতুন শহরটা খুব নির্জন ছিল।
কলেজের পাশ দিয়ে রেললাইন গেছে। সন্ধ্যা নামলে দূরে ট্রেনের শব্দ শোনা যেত। কুদ্দুস ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিল। ঘরে একটি টেবিল, কয়েকটি বইয়ের তাক আর জানালার পাশে কাঠের চেয়ার।
রাতে সে প্রায়ই জানালার পাশে বসে থাকত।
দূরে বৃষ্টি পড়ত।
আর অকারণেই মনে পড়ত নিহারিকার কথা।
একদিন পুরোনো ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শুনছিল সে। হেমন্তের কণ্ঠ ভেসে আসছিল—
“এই পথ যদি না শেষ হয়...”
হঠাৎ তার বুকের ভেতর অদ্ভুত ব্যথা জমল।
কারণ কিছু গান মানুষকে তার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
ঢাকাতেও তখন বৃষ্টি।
নিহারিকা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে একটি প্রকাশনীতে কাজ শুরু করেছে। চারপাশে মানুষ, ব্যস্ততা, শব্দ—সবকিছু আছে। তবুও দিনশেষে বাসায় ফিরে তার ভেতরে কেমন নিঃসঙ্গতা নেমে আসে।
রাতে মাঝে মাঝে সে ছাদে উঠে দাঁড়ায়।
ঢাকার আকাশ পুরো দেখা যায় না। উঁচু বিল্ডিংয়ের ফাঁক দিয়ে ছোট্ট এক টুকরো আকাশ দেখা যায়।
সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তার মনে হয়, একই আকাশের নিচে কোথাও কুদ্দুসও হয়তো দাঁড়িয়ে আছে।
একই বৃষ্টি দেখছে।
একইভাবে কাউকে মনে করছে।
এই ভাবনাটা তাকে অদ্ভুত শান্তি দেয়।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে নিহারিকা নিউমার্কেটের পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুকেছিল।
বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ সে জীবনানন্দ দাশের একটি পুরোনো সংস্করণ পেল।
বইটি খুলতেই ভেতর থেকে শুকিয়ে যাওয়া একটি কদম ফুল মাটিতে পড়ে গেল।
নিহারিকার বুক ধক করে উঠল।
মনে হলো, সময় আসলে কোথাও থেমে থাকে।
কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না।
সে ধীরে ফুলটা তুলে বইয়ের ভেতরে রেখে দিল।
তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,
— “তুমি কি এখনও আমাকে মনে রাখো, কুদ্দুস?”
চারপাশের ভিড়ের মাঝে কেউ উত্তর দিল না।
তবুও কেন জানি তার মনে হলো, দূরে কোথাও কেউ এই প্রশ্ন শুনে ফেলেছে।
কুদ্দুসও তখন স্মৃতির সঙ্গে বসবাস করতে শিখে গেছে।
কলেজ থেকে ফিরে প্রায়ই সে পুরোনো চিঠিগুলো বের করে পড়ে।
একটি চিঠির ভাঁজে নিহারিকার হাতের লেখা—
“দূরে থাকলেও কিছু মানুষ খুব কাছে থাকে।”
এই লাইনটি পড়লে তার চোখ দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে থাকে।
সে কখনো নতুন করে কাউকে জীবনে আনতে পারেনি।
চেষ্টা করেনি বললেও ভুল হবে না।
কারণ তার ভেতরের জায়গাটা এখনও একজনের জন্যই রয়ে গেছে।
শীতের এক সন্ধ্যায় কলেজ থেকে ফেরার পথে কুদ্দুস স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল।
কুয়াশার ভেতর ট্রেন ঢুকছিল ধীরে ধীরে। চায়ের দোকানে পুরোনো গান বাজছিল ক্ষীণস্বরে।
হঠাৎ তার মনে হলো, যদি এই ট্রেন থেকে এখন নিহারিকা নেমে আসে?
যদি হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে বলে—
“এতদিন কোথায় ছিলে?”
অসম্ভব কল্পনা।
তবুও মানুষ অপেক্ষা করতে করতে কখনো কখনো অসম্ভব স্বপ্নও বিশ্বাস করতে শেখে।
এদিকে নিহারিকার পরিবার এখনও তার ওপর অভিমান করে আছে। আত্মীয়দের কথাও কম শোনেনি সে।
কিন্তু গভীর রাতে যখন সব শব্দ থেমে যায়, তখন তার মনে হয়—নিজের হৃদয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে বেঁচে থাকা আরও কঠিন।
সে জানে না ভবিষ্যৎ কোথায় নিয়ে যাবে।
শুধু জানে, পৃথিবীর কোনো এক শহরে একজন মানুষ আছে, যে তাকে নিঃশব্দে ভালোবেসে গেছে।
আর সেই অনুভূতিটুকুই তাকে বাঁচিয়ে রাখে।
এক রাতে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল।
দুই শহরে দুই মানুষ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে একই আকাশ দেখছিল।
একজন দূরের ট্রেনের শব্দ শুনছিল, আরেকজন পুরোনো গানের সুর।
তবুও তাদের অনুভূতি একই ছিল।
অপেক্ষা।
নিঃশব্দ, গভীর, দীর্ঘ এক অপেক্ষা।
কারণ কিছু ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না।
সেগুলো শুধু সময়ের ভেতর ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে ওঠে।
চলবে..........