ঢাকা, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ১১:৪২:০৪ AM

জানা-অজানা ইতিহাস ও গণমাধ্যম

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
07-10-2026 09:56:24 AM
জানা-অজানা ইতিহাস ও গণমাধ্যম

রিকশায় বসে থাকা মানুষটি শহীদ সাংবাদিক তুরাব। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি প্রাণ হারান। তিনি ছিলেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান এবং দৈনিক জালালাবাদের ক্রাইম রিপোর্টার। আর আহত তুরাবকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন—তিনিও একজন সাংবাদিক।

একজন সাংবাদিকের শেষ যাত্রার এই দৃশ্য নিছক একটি ছবি নয়; এটি সাংবাদিকতার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা, দায়িত্ববোধ এবং বাস্তবতার এক নির্মম দলিল। ছবিটির দিকে তাকালে মনে হয়, একজন মানুষকে শুধু হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে না—সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সাংবাদিকতার এক গভীর বেদনা, দায়িত্ব এবং আত্মত্যাগের গল্প।

আমার মনে আছে, তুরাব জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাত্র দুই-তিন মাস আগে বিয়ে করেছিলেন। জীবনের তখন কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা, কত সম্ভাবনা সামনে ছিল! নতুন সংসার, নতুন জীবন—সবকিছুই তখন মাত্র শুরু। অথচ মানুষের কথা বলার এবং সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার জীবন থেমে গেল অকালে।

তুরাবের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রেখে যায়—সাংবাদিকরা যখন পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন, তখন তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

যারা সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের সময় মারধর করেন, হামলা করেন, ভয় দেখান কিংবা তাদের ক্যামেরা, কলম ও মাইক্রোফোনকে শত্রু মনে করেন, তাদের কাছে একটাই অনুরোধ—একবার থামুন, ভাবুন।

এই ক্যামেরা, এই কলম, এই মাইক্রোফোন কোনো সাংবাদিকের ব্যক্তিগত অস্ত্র নয়। এগুলো মানুষের কথা বলার মাধ্যম। সমাজের অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, নিপীড়ন, বৈষম্য এবং মানুষের অধিকারহরণের ঘটনা তুলে ধরাই সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের বহু সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, হামলার শিকার হয়েছেন এবং কেউ কেউ জীবনও দিয়েছেন।

ইতিহাসের পাতা উল্টালেও তার অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, শাসক বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টেছে; কিন্তু সত্য তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকদের আত্মত্যাগের ইতিহাস থেকে গেছে।

ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে, কাল তিনিই হয়তো ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি সাধারণ মানুষ, বিরোধী মত এবং বিশেষ করে সত্য তুলে ধরার দায়িত্বে থাকা সাংবাদিকদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন—সেই আচরণই একদিন তার নিজের ইতিহাসের অংশ হয়ে দাঁড়াবে।

পদ হারানো যায়, ক্ষমতা হারানো যায়, চেয়ার বদলে যায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে আচরণের যে দাগ পড়ে, তা সহজে মুছে ফেলা যায় না।

তাই কোনো সাংবাদিককে আঘাত করার আগে মনে রাখা প্রয়োজন—ক্যামেরার পেছনেও একজন মানুষ আছেন, কলমের পেছনেও একটি জীবন আছে, আর মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিও কারও সন্তান, কারও স্বামী, কারও বাবা, কারও ভাই কিংবা কারও স্বপ্নের মানুষ।

সাংবাদিকের কাজের সঙ্গে মতভেদ থাকতে পারে। কোনো প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু মতের বিরোধ কখনোই একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা, নির্যাতন কিংবা তার কণ্ঠরোধের কারণ হতে পারে না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে শুধু সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা করা নয়; বরং মানুষের জানার অধিকার এবং একটি সমাজের সত্য জানার পথকে সুরক্ষিত রাখা।

শহীদ তুরাবের রক্ত যেন আমাদের অন্তত এটুকু শিক্ষা দেয়—সত্যের কণ্ঠ সাময়িকভাবে রোধ করা যায়, একজন সাংবাদিককে থামিয়ে দেওয়া যায়; কিন্তু ইতিহাসকে চুপ করানো যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সত্য ফিরে আসে, আর মানুষের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় নিজের সাক্ষ্য রেখে যায়।