ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:১৮:৪৫ AM

”নিহারিকা”

মান্নান মারুফ
26-05-2026 12:50:47 PM
”নিহারিকা”

শেষ পর্ব
মানুষ কখনো বুঝতে পারে না, কোন দেখা শেষ দেখা হয়ে থাকবে।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর কিছুদিন যেন সবকিছু একটু বদলে গিয়েছিল। কুদ্দুস আর নিহারিকার মাঝের দীর্ঘ নীরবতা ধীরে ধীরে ভাঙছিল। তারা নিয়মিত কথা বলত না, তবুও প্রতিদিনের ভেতরে একে অপরের উপস্থিতি অনুভব করত।
কখনো সকালে একটি ছোট্ট বার্তা—
“আজ খুব বৃষ্টি।”
অথবা রাতে—
“পুরোনো গান শুনছিলাম, তোমার কথা মনে পড়ল।”
এত অল্প শব্দের মাঝেও তাদের সম্পর্কের গভীরতা ছিল অসীম।
কুদ্দুস মাঝে মাঝে ভাবত, এত বছর পরে হয়তো জীবন তাদের প্রতি একটু দয়ালু হয়েছে।
কিন্তু জীবন সবসময় মানুষকে তার চাওয়া অনুযায়ী সব দেয় না।
থথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথ
শীত শেষ হয়ে গ্রীষ্ম আসছিল।
ঢাকার বাতাসে ক্লান্ত ধুলো উড়ছিল। নিহারিকা আবার অসুস্থ হতে শুরু করল। প্রথমে সাধারণ দুর্বলতা ভেবেছিল সবাই। পরে পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে আসার পর ডাক্তারদের মুখের নীরবতা সব বলে দিয়েছিল।
রোগটা জটিল।
অনেক দেরিতে ধরা পড়েছে।
নিহারিকা খবরটা শুনে খুব শান্ত ছিল।
শুধু জানালার বাইরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, মানুষ আসলে মৃত্যুকে যতটা ভয় পায়, তার চেয়ে বেশি ভয় পায় অসমাপ্ত অনুভূতিগুলোকে।
থথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথ
কুদ্দুস যখন খবরটা জানল, তখন সন্ধ্যা নামছিল।
তার মনে হলো, পৃথিবীটা আবার হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেছে।
সে পরদিনই ঢাকায় চলে এল।
হাসপাতালের সেই একই কেবিন।
সাদা দেয়াল।
নিঃশব্দ করিডোর।
তবে এবার বাতাসে এক ধরনের অদ্ভুত শেষবেলার গন্ধ ছিল।
নিহারিকা বিছানায় আধশোয়া ছিল। শরীর অনেক শুকিয়ে গেছে। তবুও চোখ দুটো এখনও আগের মতোই শান্ত।
কুদ্দুসকে দেখে সে মৃদু হাসল।
— “তুমি আবার এসেছো।”
কুদ্দুস খুব ধীরে তার পাশে বসে বলল,
— “যেতে পারিনি।”
নিহারিকা কিছু বলল না।
শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ।
সেই দৃষ্টির ভেতরে বহু বছরের ভালোবাসা জমে ছিল।
থথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথ
দিনগুলো ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছিল।
কুদ্দুস প্রায় প্রতিদিন হাসপাতালে থাকত। কখনো বই পড়ে শোনাত, কখনো চুপচাপ বসে থাকত।
একদিন বিকেলে বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল।
নিহারিকা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “মনে আছে? প্রথম যেদিন লাইব্রেরিতে দেখা হয়েছিল, সেদিনও বৃষ্টি ছিল।”
কুদ্দুস মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল,
— “তুমি ‘রূপসী বাংলা’ খুঁজছিলে।”
— “আর তুমি এমনভাবে তাকিয়ে ছিলে, যেন কথা বলতে ভুলে গেছো।”
অনেকদিন পর দু’জনেই একটু হেসেছিল।
তবুও সেই হাসির ভেতরে কষ্ট লুকিয়ে ছিল।
কারণ তারা দু’জনেই বুঝতে পারছিল, সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
থথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথ
এক রাতে নিহারিকা খুব আস্তে বলল,
— “কুদ্দুসৃ”
— “হুঁ?”
— “আমরা যদি একটু আগে একে অপরকে বলতাম?”
কুদ্দুস দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নিচু স্বরে বলল,
— “তাহলেও হয়তো তোমাকে এতটাই ভালোবাসতাম।”
নিহারিকার চোখ ভিজে উঠল।
সে ধীরে বলল,
— “জানো, আমি কখনো কাউকে তোমার জায়গায় বসাতে পারিনি।”
কুদ্দুস তার হাত শক্ত করে ধরল।
এই প্রথম তাদের ভালোবাসা এত স্পষ্ট, এত নির্ভীক হয়ে উঠেছিল।
অথচ সময় তখন শেষের দিকে।
থথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথ
এরপরের দিনগুলো আরও কঠিন হয়ে উঠল।
নিহারিকার শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে কথা বলতেও কষ্ট হতো।
তবুও কুদ্দুস এলে তার চোখে শান্তি নেমে আসত।
এক সন্ধ্যায় সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে নিহারিকা খুব কষ্ট করে বলল,
— “একটা কথা রাখবে?”
— “রাখব।”
— “আমাকে ভুলে যেও না।”
কুদ্দুসের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভেঙে পড়ল।
সে কাঁপা গলায় বলল,
— “তুমি দূরে ছিলে, কিন্তু কোনোদিন আমার বাইরে ছিলে না। ভুলব কীভাবে?”
নিহারিকার ঠোঁটে ম্লান হাসি ফুটল।
তারপর খুব আস্তে চোখ বন্ধ করল।
থথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথ
সেই রাতেই বৃষ্টি নেমেছিল।
ঢাকার আকাশ কাঁদছিল নিঃশব্দে।
হাসপাতালের সাদা ঘরে সমস্ত শব্দ একসময় থেমে গেল।
ডাক্তার এসে কুদ্দুসের কাঁধে হাত রাখলেন।
কুদ্দুস কিছু বলল না।
শুধু নিহারিকার নিস্তব্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় একটি ঋতু হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে। চারিদিকে শুধু অন্ধকার,আর অন্ধকার !
থথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথ
অনেক বছর কেটে গেছে তারপর।
কুদ্দুস এখন আরও নীরব মানুষ।
সে এখনও শিক্ষকতা করে। এখনও বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে থাকে। এখনও পুরোনো গান শোনে।
আর প্রতি রাতে কাঠের আলমারি খুলে টিনের সেই পুরোনো বাক্সটা বের করে।
ভেতরে যতœ করে রাখা আছে নিহারিকার সব চিঠি।
শুকিয়ে যাওয়া কদম ফুল।
ঈদের কার্ড।
আর হলুদ হয়ে যাওয়া কিছু কাগজ।
কুদ্দুস ধীরে ধীরে চিঠিগুলো পড়ে।
কখনো হাসে।
কখনো চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
তার মনে হয়, নিহারিকা কোথাও যায়নি।
সে এখনও বৃষ্টির শব্দে আছে।
পুরোনো বইয়ের গন্ধে আছে।
রাতের ট্রেনের হুইসেলে আছে।
সবচেয়ে বেশি আছে—তার অন্তরের ভেতরে।
কারণ কিছু মানুষকে মৃত্যু আলাদা করতে পারে না।
তারা স্মৃতির চেয়েও গভীর কোথাও বেঁচে থাকে।
জানালার বাইরে তখন ধীরে ধীরে ভোর হচ্ছিল।
কুদ্দুস শেষ চিঠিটা বুকে চেপে চোখ বন্ধ করল।
আর খুব নিঃশব্দে মনে হলো, দূর থেকে কেউ যেন আবার ডাকছে তাকে।
“কুদ্দুস...”
মানুষ চলে যায়, কিন্তু অন্তরে থাকা নামগুলো কখনো মুছে যায় না।
।।সমাপ্ত।।