ঢাকা, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১১:৩৮:৫৭ PM

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু রোগীর তথ্যে গরমিলের অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
04-07-2026 10:05:37 PM
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু রোগীর তথ্যে গরমিলের অভিযোগ

রাজধানীতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তথ্যগত অসঙ্গতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। দুই সিটি করপোরেশনের দাবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রতিদিন সরবরাহ করা ডেঙ্গু রোগীর তালিকায় রোগীদের ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও অন্যান্য তথ্যের অসংগতি থাকায় মাঠপর্যায়ে রোগী শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এর ফলে আক্রান্ত এলাকার আশপাশে প্রয়োজনীয় মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি সমাধানের জন্য একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। তাদের ভাষ্য, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রোগীর সঠিক অবস্থান জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো এলাকায় রোগী শনাক্ত হলে ওই বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা ধ্বংস এবং মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। কিন্তু ভুল তথ্যের কারণে অনেক সময় নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে রোগী বা সংশ্লিষ্ট বাসা খুঁজে পাওয়া যায় না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে যে তালিকা দেওয়া হয়, তার উল্লেখযোগ্য অংশের তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর নাম, মোবাইল নম্বর কিংবা ঠিকানা ভুল বা অসম্পূর্ণ থাকে। আবার দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চিকিৎসার জন্য রাজধানীর হাসপাতালে আসা রোগীরা অনেক সময় ঢাকায় থাকা আত্মীয়-স্বজনের ঠিকানা ব্যবহার করেন। ফলে প্রকৃত আক্রান্ত এলাকা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং রোগীর তথ্য ঢাকার নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তারা নিজেরা কোনো তথ্য তৈরি করেন না। রাজধানীর ২০টি সরকারি হাসপাতাল, ৪২টি বেসরকারি হাসপাতাল এবং ঢাকার বাইরের ৭১টি হাসপাতাল প্রতিদিন নির্ধারিত ছকে ডেঙ্গু রোগীদের তথ্য কন্ট্রোল রুমে পাঠায়। এসব তথ্যের মধ্যে নতুন ভর্তি, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা, মৃত্যুর সংখ্যা এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে। কন্ট্রোল রুম শুধু বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও গণমাধ্যমে প্রকাশ করে।

এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নির্ভুল তথ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কোন এলাকায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি কিংবা কোন ওয়ার্ডে দ্রুত অভিযান চালানো প্রয়োজন—এসব সিদ্ধান্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করে। তাই তথ্যে অসঙ্গতি থাকলে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বিলম্বিত হয় এবং সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ—এই চারটি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, শুধু মশা নিধন অভিযান পরিচালনা করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। একইভাবে কেবল চিকিৎসাসেবা উন্নত করেও সংক্রমণ কমানো যাবে না। প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে হলে নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য যথাযথ ও নির্ভরযোগ্য হওয়া জরুরি।

ডেঙ্গু রোগীর তথ্য নিয়ে এই বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৩ সালে রাজধানীতে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের সময়ও একই ধরনের সমস্যা সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ২৬ মে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে এ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠান।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রোগীরা রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হলেও অনেকে ঢাকায় থাকা আত্মীয়দের ঠিকানা ব্যবহার করেন। ফলে এসব রোগীকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির বাসিন্দা হিসেবে গণনা করা হয়, যা প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে সিটি করপোরেশন রোগীর বাসার আশপাশে প্রায় ৩০০ গজ এলাকায় বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু ভুল ঠিকানার কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন এবং কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে।

চিঠিতে রোগীদের সঠিক ও বিস্তারিত ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং পরিচয় নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হলেও দুই বছরেরও বেশি সময় পরও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ সিটি করপোরেশনের।

সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে ডিএনসিসি সূত্র জানায়, গত ৩০ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের এলাকায় ১৭ জন ডেঙ্গু রোগীর তথ্য পাঠায়। কিন্তু যাচাই-বাছাই শেষে দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে মাত্র ১২ জন রোগী ডিএনসিসি এলাকার বাসিন্দা। অন্যান্য দিনের তালিকাতেও একই ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। একই অভিযোগ রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেরও।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সক্রিয়। তবে তথ্য ব্যবস্থাপনায় এখনও বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। তার দাবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্য সরবরাহ করছে। তিনি জানান, কোনো কোনো দিন অধিদপ্তর ডিএনসিসি এলাকায় ১৮ জন রোগী ভর্তি থাকার তথ্য দিলেও যাচাই করে দেখা যায়, প্রকৃত রোগীর সংখ্যা অনেক কম। বাকি রোগীরা নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ কিংবা নরসিংদীসহ আশপাশের জেলার বাসিন্দা।

তিনি আরও বলেন, ভুল তথ্যের কারণে মশক নিধন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনমনে বিভ্রান্তিও সৃষ্টি হয়। অনেক সময় রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগী বৃদ্ধির তথ্য প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট এলাকার ওপর দায় বর্তায়। কিন্তু বাস্তব যাচাইয়ে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন। এ কারণে রোগীদের সঠিক নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ডেঙ্গু সংক্রান্ত সব তথ্য হাসপাতাল থেকেই অনলাইনে সার্ভারে পাঠানো হয়। সেখানে রোগীর বয়স, লিঙ্গ, ভর্তি, সুস্থ হওয়া ও মৃত্যুসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মূলত হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য সমন্বয় করে প্রকাশ করে। ফলে তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল পর্যায়েও আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।