ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০২:০২:২৭ PM

পর্ষদ দ্বন্দ্ব ও ঋণ বিতর্কে গভীর উদ্বেগ পূবালী ব্যাংক

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
28-07-2026 09:55:48 AM
পর্ষদ দ্বন্দ্ব ও ঋণ বিতর্কে গভীর উদ্বেগ পূবালী ব্যাংক

দেশের অন্যতম প্রাচীন বেসরকারি ব্যাংক পূবালী ব্যাংক দীর্ঘদিনের পর্ষদ-সংকট, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অমান্য, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনিয়ম এবং বিতর্কিত ঋণ বিতরণের অভিযোগে গভীর সুশাসন সংকটে পড়েছে। অনুসন্ধানে গুরুতর অনিয়মের তথ্য মিললেও তদন্ত মাঝপথে থেমে যাওয়া এবং কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ব্যাংকটির জবাবদিহি ও তদারকি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট (এফআইসিএসডি)-এর আংশিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পূবালী ব্যাংকের কয়েকটি শাখা আমদানি এলসি নিষ্পত্তির সময় ঘোষিত বাজারদরের চেয়ে প্রতি ডলারে ৬ দশমিক ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকের হিসাবে জমা না হয়ে তৃতীয় পক্ষের গ্রাহক রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেডের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে, যা ব্যাংকিং আইন ও বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রস্তুত করা অসম্পূর্ণ অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বরিশাল বাজার রোড শাখায় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মোহাম্মদী ইলেকট্রিক ওয়্যার অ্যান্ড মাল্টি প্রোডাক্টস লিমিটেডের প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ডলারের একটি এলসি নিষ্পত্তির সময় অতিরিক্ত প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় করে তা রিফাত গার্মেন্টসের হিসাবে জমা করা হয়। একই ধরনের অনিয়ম সিলেট শাখায় মেসার্স হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্সের চারটি এলসির ক্ষেত্রেও পাওয়া যায়, যেখানে অতিরিক্ত প্রায় ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা একই হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।

রিফাত গার্মেন্টস হা-মীম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান দ্যাটস ইট ফ্যাশনস লিমিটেড পূবালী ব্যাংকের অন্যতম বড় শেয়ারহোল্ডার এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি আবদুর রাজ্জাক মন্ডল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, এলসি খোলা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রিফাত গার্মেন্টসের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। তবে সেই দাবির পক্ষে ভ্যাট চালান বা অন্য কোনো বৈধ নথি তারা তদন্তকারীদের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর কর্মকর্তাদের মতে, ঘোষিত দরের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে তৃতীয় পক্ষের হিসাবে স্থানান্তর করা উচ্চঝুঁকির মানি লন্ডারিংয়ের লক্ষণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ অপারেশন বিভাগও এটিকে বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তদন্তকারীরা প্রায় ৫০টি এলসিতে একই ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করলেও মাত্র পাঁচটি বিশ্লেষণের পর অনুসন্ধান বন্ধ হয়ে যায়। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবেদনটি ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পড়ে থাকলেও দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনিয়মের অভিযোগ পূবালী ব্যাংকের জন্য নতুন নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের এক পরিদর্শনে দেখা যায়, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে একটি শাখা সরকারি নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে ডলার কিনে প্রায় ২১১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। একই সময়ে সরকারি প্রণোদনা তহবিল থেকেও ৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা অপচয়ের তথ্য উঠে আসে। পরিদর্শকরা অন্যান্য অনুমোদিত ডিলার শাখাতেও বড় ধরনের অনিয়মের আশঙ্কা প্রকাশ করলেও সেই তদন্তও আর এগোয়নি।

ঋণ বিতরণ নিয়েও ব্যাংকটির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। দুদক ও বিএফআইইউর নথি অনুযায়ী, রিফাত গার্মেন্টস, ক্রিয়েটিভ ফ্যাশন, করিম গ্রুপ, বন্দর স্টিল, হক গ্রুপ, রানু এগ্রো ও তামিম এগ্রোসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সেই ঋণের অর্থ অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহৃত হয়েছে, যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও তহবিল ব্যবহারে গুরুতর ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিএফআইইউ পৃথক তদন্ত করছে। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, বর্তমানে তিনটি অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। অভিযোগগুলো বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, নিয়োগে বিধি লঙ্ঘন এবং ১৩টি প্রতিষ্ঠানে ঋণ বিতরণসংক্রান্ত। তিনি বলেন, অতিরিক্ত ডলারমূল্য আদায় করে নির্দিষ্ট গ্রাহকের হিসাবে অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পাশাপাশি ৭০টি নিয়োগসংক্রান্ত নথি এবং ঋণের কাগজপত্র বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলীর পুনর্নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি হতে কমপক্ষে ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, অথচ তাঁর অভিজ্ঞতা ১৬ বছর। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন বিধান পূর্বপ্রযোজ্য নয় এবং আগে নিয়োগপ্রাপ্তদের পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়টি ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে ব্যাংকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে মন্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও মোহাম্মদ আলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জর্জরিত। ২০০৮ সাল থেকে চেয়ারম্যান পদ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ মূলত ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স-সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের হাতেই রয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান ছিলেন হাফিজ আহমেদ মজুমদার। পরে ২০২০ সালে ডেল্টা লাইফের প্রতিনিধি মনজুরুর রহমান চেয়ারম্যান হন এবং এখনো দায়িত্বে রয়েছেন।

বড় শেয়ারহোল্ডারদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে অন্যদের প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত করেছে। ২০১৪ সালে ন্যূনতম শেয়ারধারণের শর্ত পূরণ না করায় হাইকোর্ট আট পরিচালককে অযোগ্য ঘোষণা করলেও পর্ষদের ক্ষমতার ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। পরবর্তীতে মামলা চলাকালে প্রক্সি ভোটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অভিযোগও ওঠে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ পরিচালক অপসারণের নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একটি গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন করপোরেট সুশাসন দুর্বল করেছে। বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, ঋণ বিতরণ এবং পরিচালনাগত অনিয়মের পুনরাবৃত্তি, পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি থেমে যাওয়ার ঘটনা পূবালী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।