বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতিতে ত্যাগ, নির্যাতন ও দীর্ঘ সংগঠনিক অভিজ্ঞতার যে ক’জন নেতার নাম বারবার উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, রুহুল কবির রিজভী, সেলিমা রহমান, নজরুল ইসলাম খান, শামসুজ্জামান দুদু, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জয়নাল আবেদীন ফারুক, হাবিবুন নবী সোহেল এবং রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের প্রত্যেকের ত্যাগ ও ভূমিকা বিএনপির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, পরীক্ষিত ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না করা হলে তা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে দলের জন্যও অকল্যাণকর হতে পারে।
ত্যাগ ও নির্যাতনের দীর্ঘ ইতিহাস
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় গয়েশ্বর চন্দ্র রায় একাধিকবার কারাবরণ, মামলা, হামলা ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও কর্মসূচি পালনকালে তিনি পুলিশি লাঠিচার্জের মুখে পড়েন। সত্তরোর্ধ্ব এই নেতাকে রাজপথে ফেলে প্রহারের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। দলীয় কর্মীদের দাবি, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি শুধু ব্যক্তিগতভাবে নন, বরং দলের সংগ্রামী ইতিহাসের প্রতীক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছেন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উত্তরণ
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের রাজনৈতিক সূচনা ষাটের দশকে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর দর্শন বিভাগের ছাত্র ছিলেন এবং জগন্নাথ হল শাখার মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন। প্রথমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এবং পরে জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন আসে।
১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর আহ্বানে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং যুবদলের মাধ্যমে সক্রিয় সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। প্রতিষ্ঠালগ্নে দল গঠনের প্রক্রিয়ায় তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে বিএনপির পরীক্ষিত নেতাদের কাতারে স্থান করে দেয়।
যুবদলকে সংগঠিত করার নেপথ্য ভূমিকা
১৯৮৭ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত টানা প্রায় ১৫ বছর তিনি কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে সারা দেশে সংগঠন বিস্তারে তিনি ব্যাপক ভ্রমণ করেন, তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠন, কর্মী সংগ্রহ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন। দলীয় নেতাদের ভাষ্য, তাঁর হাতে গড়া বহু যুবনেতা পরবর্তীতে বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন। যুবদল থেকে উঠে আসা এই নেতৃত্বই দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়ক হয়েছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে ভূমিকা
২০০২ সালে তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব পদে উন্নীত হন। পরে ২০০৯ সালে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম—স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। এই পর্যায়ে এসে তিনি শুধু সংগঠক হিসেবেই নয়, বরং দলীয় কৌশল ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে তাঁর বক্তব্য ও অবস্থান দলীয় কর্মীদের মধ্যে আলোচিত হয়েছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনীতিতে প্রভাব
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সনাতন সম্প্রদায়ভুক্ত একজন শীর্ষস্থানীয় বিএনপি নেতা। দলীয় নেতাকর্মীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ অন্য রাজনৈতিক শক্তির প্রতি সমর্থন দিলেও, গয়েশ্বর রায়ের উপস্থিতি বিএনপিতে ওই সম্প্রদায়ের একটি অংশকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করেছে।
বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সনাতন সম্প্রদায়ের ছাত্রনেতাদের মধ্যে তাঁর প্রভাব রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানায়। নির্বাচনী প্রচারণায় সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে গিয়ে স্থানীয় নেতারা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উদাহরণ তুলে ধরেন—এমন দাবিও শোনা যায়।
‘ভোটব্যাংক’ রাজনীতির প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ভোটকে প্রায়ই ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির প্রতি একক সমর্থনের প্রবণতা নিয়ে বিশ্লেষণ রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু ভোটের একটি অংশ বিএনপির প্রতিও আস্থা রেখেছে—এমন বক্তব্য দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের কাছ থেকে এসেছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সম্প্রদায়ের ভোট শতভাগ একটি দলের দিকে ঝুঁকেছে—এমন দাবি পরিসংখ্যান ও গবেষণা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। নির্বাচনী ফলাফল ও জরিপ বিশ্লেষণের মাধ্যমেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
মূল্যায়নের প্রশ্ন ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও সাংগঠনিক অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে তা তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন অনেকেই। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ হলো অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ও নতুন প্রজন্মের সমন্বয়ে একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সমর্থকদের মতে, তাঁর মতো নেতাদের যথাযথ সম্মান ও ভূমিকা নিশ্চিত করা হলে তা দলের ঐক্য ও শক্তিকে আরও সুসংহত করবে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের অভিমত, ব্যক্তি-নির্ভরতার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও নীতিনির্ভর রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।
সব মিলিয়ে বলা যায়, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের রাজনৈতিক জীবন বিএনপির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রভাব—এসব বিষয় নিয়ে দলীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আগামী দিনে দল কীভাবে তাঁর অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক পুঁজি কাজে লাগায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।