ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪,
সময়: ১০:৪৪:৪৯ PM

২১৯ মাদরাসার নির্মাণকাজ পাঁচ বছর বন্ধ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
19-09-2024 10:44:49 PM
২১৯ মাদরাসার নির্মাণকাজ পাঁচ বছর বন্ধ

দেশের মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে ২০১৮ সালে সোয়া ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ দেয় সরকার। একই বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় একনেক। ‘নির্বাচিত মাদরাসার উন্নয়ন’ নামে এক হাজার ৮০০ মাদরাসার অবকাঠামো নির্মাণে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর মেয়াদ বেড়েছে এক দফা। সেই হিসাবে আগামী বছরের জুনে প্রকল্পের সব কাজ শেষ করার কথা। অথচ এ প্রকল্পের আওতায় ২১৯ মাদরাসায় ভবন নির্মাণের কোনো কাজ এখনো শুরুই হয়নি।এছাড়া ৯৩৭ মাদরাসায় ভবন নির্মাণকাজ শুরু হলেও তা থমকে আছে। যেসব মাদরাসায় ভবন নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, সেখানে আসবাব সরবরাহে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় দেখা দিয়েছে নতুন বিপত্তি। সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি মাত্র ১১ দশমিক ৭০ শতাংশ। ফলে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয়ে খোদ প্রকল্প পরিচালক।পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ভুঁইফোঁড় মাদরাসার তালিকা দেওয়া, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা এবং পরিচালকের অযোগ্যতায় মুখ থুবড়ে পড়েছে শিক্ষার বড় এ উন্নয়ন প্রকল্প। পাশাপাশি আসবাব কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ ও তা তদন্তের কারণেও থমকে গেছে প্রকল্পের কাজ। এতে প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও।প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ছয় হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা, ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জন, এসডিজি-৪ বাস্তবায়ন ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। ‘নির্বাচিত মাদরাসাসমূহের উন্নয়ন’ নামে এ প্রকল্পের পুরো অর্থ জোগান দেওয়া হচ্ছে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে এক হাজার ৮০০ মাদরাসার। এতে দেশের ৩০০ নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্যরা প্রত্যেকে ছয়টি করে মাদরাসার তালিকা দেন।নির্বাচিত মাদরাসাগুলোতে চারতলা ও ছয়তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজ করার কথাও রয়েছে। পাশাপাশি এসব মাদরাসায় সরবরাহ করা হচ্ছে নতুন আসবাব ও কম্পিউটার। বড় বাজেটের এই প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়েছে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও।২০১৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। তবে সেই সময়ে কাজ শুরুই করতে পারেনি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। ফলে মেয়াদ বাড়ানোর জন্য তা পাঠানো হয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। এরপর এ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় কিছুটা কমানো হয়। শুরুতে ছয় হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও তা কমিয়ে সংশোধিত প্রকল্পে ধরা হয়েছে ছয় হাজার ৩১৪ কোটি টাকা।চলতি বছরের অক্টোবর মাসে এ প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই সময় (অক্টোবর) পর্যন্ত সারাদেশে এক হাজার ৫৮১টি মাদরাসায় ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এসবের মধ্যে ভবনের কাজ শেষ হয়েছে ৬৪৪ মাদরাসায়। চলমান আছে ৯৩৭টিতে। বাকি ২১৯ মাদরাসায় ভবন নির্মাণকাজ এখনো শুরুই হয়নি।সারাদেশে ৬৪৪ মাদরাসায় ভবন নির্মাণকাজ শেষ হলেও আসবাব সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৭১টিতে। প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ পেয়েছেন মাত্র এক হাজার ৫৩ শিক্ষক। সব মিলিয়ে অক্টোবর পর্যন্ত এ প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১১ দমশিক ৭০ শতাংশ। প্রকল্পের সময়সীমা ধরলে হাতে আছে মাত্র ছয় মাস। এ সময়ে বাকি ৮৮ শতাংশ কাজ শেষ করা সম্ভব নয়।বেঁধে দেওয়া সময়ে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করা সম্ভব নয় জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক দীন ইসলাম  বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে প্রকল্পে ধীরগতি ছিল। এরপর আমাকে নিয়োগ করা হলেও যোগদানের ইচ্ছে ছিল না। পরে যোগদান করেছি। চেষ্টা করছি প্রকল্প এগিয়ে নিতে। অনেক প্রকল্পই সংশোধন করতে হয়। এটিও করতে হবে। কিছু তো করার নেই।’

 

‘ভুয়া’ মাদরাসার তথ্য দেওয়া হয়েছিল জানিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব আবুল কাশেম মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘মাদরাসাগুলোর যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল, খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো সেখানে মাদরাসা নেই। পরে তালিকা সংশোধন করতে হয়েছে। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নও কিছুটা দেরি হতে পারে।’তিন দফায় প্রকল্প পরিচালক বদল

প্রকল্প শুরুর পর এ পর্যন্ত তিনজন পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ দায়িত্ব পেয়েছেন মো. দীন ইসলাম। তবে কাঙ্ক্ষিত পদায়ন না হওয়ায় তিনি দায়িত্ব বুঝে নিতে ছয়মাস দেরি করেন। এতে প্রকল্পের কাজও আটকে ছিল।

 

মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদকে এ প্রকল্পে পদায়নের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। এটি দাপ্তরিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে মাদরাসা উন্নয়ন প্রকল্পে একজন সহকারী প্রকৌশলীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়। বিষয়টি অবহিত করা হয়নি কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগকেও। এতে সরকারি কাজে প্রচলিত রীতি লঙ্ঘিত হয়েছে। এ নিয়েও প্রকল্পের কাজে ব্যাঘাত ঘটেছে।আইএমআইডি সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘এ প্রকল্পে বারবার পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। সবশেষ যিনি দায়িত্ব পেয়েছেন, তিনি প্রকল্প পরিচালক পদে যোগ দিতে গড়িমসি করেন। এখন যাতে কাজটি দ্রুত হয়, সেজন্য তাগাদা দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।’

 

আসবাব কেনাকাটায় অনিয়ম

প্রকল্পের আওতায় মাদরাসার জন্য আসবাব কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে বেনামে চিঠিও দেওয়া হয় শিক্ষামন্ত্রীকে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের নির্দেশ দেন মন্ত্রী। তাতে অভিযোগের সত্যতা মেলে। এরপর কেনাকাটার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বনে প্রকল্প পরিচালককে পরামর্শ দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও আসবাব কেনায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০০৮ অনুযায়ী, ই-জিপি সিস্টেমে পরিচালিত টেন্ডার কাজে তিন সদস্যের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে প্রকল্প অফিসবহির্ভূত সর্বোচ্চ একজন সদস্য রাখার বিধান রয়েছে। তবে অফিসবহির্ভূত দুজন (একজন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও একজন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি) এবং একজন প্রকল্প কর্মকর্তার সমন্বয়ে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি করেছেন প্রকল্প পরিচালক।অধিদপ্তরের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দুজন কর্মকর্তা জানান, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের চাপে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র ছয়মাস আগে তড়িঘড়ি করে আসবাব কেনার জন্য ২০০ কোটি টাকার ৩০টি প্যাকেজে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। এ ক্রয় কাজে রয়েছে বিভিন্ন অনিয়ম। পিপিআর অনুযায়ী বাজারদর যাচাই না করে দর নির্ধারণ ও বিধিবহির্ভূতভাবে মূল্যায়ন কমিটি করে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আইন লঙ্ঘন করেছেন।আসবাব কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক দীন ইসলাম বলেন, ‘আসবাব কেনাকাটার দরপত্রে যদি কেউ অংশ না নেন, তাহলে তো আমার কিছু করার নেই। কারণ ডিপিপির বাইরে যেতে পারবো না।’

 

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে বিধি লঙ্ঘন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের মূল্যায়ন কমিটিতে যাদের রাখা হয়েছে, মাদরাসা অধিদপ্তরসহ ঊর্ধ্বতনদের জানিয়ে তা করেছি। প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি, প্রশিক্ষকের সময় অনুযায়ী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে গিয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ঠিকমতো দেওয়া সম্ভব হয়নি।’সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ  বলেন, ‘প্রকল্পের বিষয়ে আমি তেমন কিছু জানি না। মাত্র কিছুদিন এখানে যোগদান করেছি। খোঁজ-খবর নিয়ে দেখবো।’